
রবিবারের সংসদ অধিবেশন ছিল নিছক একটি ক্যালেন্ডারগত ব্যতিক্রম নয়, ছিল একটি রাজনৈতিক সংকেত। দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন যেদিন কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬–২৭ পেশ করলেন, সেদিন সরকার কার্যত জানিয়ে দিল— তারা আর ধাপে ধাপে নয়, “মিশন মোডে” কাজ করতে চায়। লক্ষ্য সুদূর ২০৪৭, স্বাধীনতার শতবর্ষে এক ‘বিকশিত ভারত’। এই অভিযাত্রার চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হলো দেশের যুবসমাজকে। তাই বাজেটের ভাষায় এটি হয়ে উঠল “যুবশক্তি-চালিত বাজেট”।
কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই যুবশক্তি কি কেবলমাত্র অর্থনীতির জ্বালানি? নাকি তারা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের চিন্তাশীল নাগরিক, যাদের শিক্ষা কেবল কাজের দক্ষতা নয়, জীবনবোধও তৈরি করে?
হিসাবের দলিল নয়, কর্তব্যের ঘোষণাপত্র
এবারের বাজেটকে সরকার উপস্থাপন করল নিছক আয়-ব্যয়ের খতিয়ান হিসেবে নয়, বরং ‘দায়িত্ব’ ও ‘কর্তব্য’-এর দলিল হিসেবে। অর্থমন্ত্রী তিনটি মূল দায়বদ্ধতার কথা বললেন— দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ এবং ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’। এই তিনটি স্তম্ভের কেন্দ্রে রাখা হলো শিক্ষা। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির বদল চোখে পড়ে।
শিক্ষাকে আর আলাদা করে সামাজিক উন্নয়নের খাত হিসেবে দেখা হচ্ছে না। তাকে দেখা হচ্ছে পরিষেবা অর্থনীতির জন্য মানবসম্পদ তৈরির একটি কার্যকর কারখানা হিসেবে। এখানেই ২০২৬–২৭ বাজেটের সবচেয়ে বড় দার্শনিক পরিবর্তন। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ যেখানে ‘ভারতীয় মনন’-এর রূপান্তরের কথা বলেছিল, সেখানে এই বাজেট স্পষ্টভাবে ‘ভারতীয় কর্মশক্তি’-র রূপান্তরের কথা বলছে।
বড় অঙ্কের ভ্রান্ত আশ্বাস
শিক্ষা মন্ত্রকের জন্য মোট বরাদ্দ দাঁড়াল প্রায় ১ লক্ষ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। সংখ্যার হিসেবে এটি আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। কিন্তু সংখ্যার মোহ কাটিয়ে গভীরে তাকালে অন্য ছবি ভেসে ওঠে। জিডিপির শতাংশ হিসেবে শিক্ষা ব্যয় আজও ৩ শতাংশের নীচে। জাতীয় শিক্ষানীতি যেখানে ৬ শতাংশ জিডিপি ব্যয়ের কথা বলেছিল, সেখানে এই ব্যবধান শুধু অঙ্কের নয়, এটি রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন।
মুদ্রাস্ফীতি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ধরলে এই তথাকথিত বৃদ্ধি অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত রূপান্তরের জন্য যথেষ্ট নয়। এটি যেন আগুন নেভানোর জল, নতুন আগুন জ্বালানোর শক্তি নয়।
স্কুল বনাম উচ্চশিক্ষা: দ্বিমুখী রাষ্ট্রনীতি
বাজেটের কাঠামোতেই স্পষ্ট হয়ে যায় সরকারের দ্বিমুখী কৌশল। স্কুল শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি সীমিত, প্রায় রক্ষণাবেক্ষণমূলক। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষায় তুলনামূলকভাবে বেশি বৃদ্ধি, এবং সেই বৃদ্ধির লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট— চাকরিমুখী দক্ষতা।
এর অর্থ দাঁড়ায়, রাষ্ট্র স্কুল শিক্ষাকে ন্যূনতমভাবে টিকিয়ে রাখতে চায়, আর উচ্চশিক্ষাকে ব্যবহার করতে চায় দ্রুত অর্থনৈতিক ফলনের হাতিয়ার হিসেবে। কিন্তু দুর্বল ভিত্তির উপর কি শক্ত কর্মশক্তি তৈরি হয়?
PM-SHRI: মডেল স্কুল না দ্বিস্তরীয় বাস্তবতা
PM-SHRI প্রকল্পের অধীনে প্রায় ১৪,৫০০টি ‘মডেল স্কুল’ তৈরির পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। স্মার্ট ক্লাস, ডিজিটাল লাইব্রেরি, আধুনিক মূল্যায়ন পদ্ধতি— সবকিছুই থাকবে। কিন্তু দেশের লক্ষ লক্ষ সাধারণ সরকারি স্কুলের বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন।
যেখানে এখনো শৌচালয় নেই, ছাদ ভাঙা, একজন শিক্ষকেই পুরো স্কুল চালাতে হয়, সেখানে এই মডেল স্কুল কি কার্যত একটি দুই-স্তরের সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করছে না? অনেক রাজ্যের অভিযোগ, এই প্রকল্প আসলে কেন্দ্রীয়ভাবে জাতীয় শিক্ষানীতি চাপিয়ে দেওয়ার একটি প্রশাসনিক হাতিয়ার।
ডিজিটাল স্বপ্নের মাটিতে বাস্তবতার ধুলো
১৫,০০০ স্কুলে AVGC কনটেন্ট ক্রিয়েটর ল্যাব তৈরির ঘোষণা শোনাতে ভবিষ্যতমুখী। কিন্তু বাস্তবতা নির্মম। বহু গ্রামীণ এলাকায় আজও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নেই, ব্রডব্যান্ড সংযোগ নেই, প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই। ফলে আশঙ্কা প্রবল— এই ল্যাবগুলো হয়ে উঠবে তালাবদ্ধ ঘর, ধুলো জমা কম্পিউটার, কাগজে-কলমে সাফল্য।
শিক্ষাবিদদের প্রশ্ন সহজ— আমাদের টার্মিনাল নয়, শিক্ষক চাই। প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে, বিকল্প নয়।
কেভিএস ও নবোদয়: সেরাদের জন্য সেরা
কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় ও নবোদয় বিদ্যালয়ে বরাদ্দ বৃদ্ধি গুণগত শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রের আগ্রহ দেখায়। সন্দেহ নেই, এই প্রতিষ্ঠানগুলি ভালো ফল দিচ্ছে। কিন্তু তারা দেশের মোট ছাত্রসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশকেই কভার করে।
দেশের অধিকাংশ শিশু পড়ে রাজ্য বোর্ডের স্কুলে। সেই স্কুলগুলির অবকাঠামো, শিক্ষকসংকট এবং প্রশাসনিক চাপ অব্যাহত থাকে। ফলে উৎকর্ষ হয়ে ওঠে নির্বাচিতদের অধিকার, সার্বজনিক অধিকার নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় কি প্লেসমেন্ট এজেন্সি?
২০২৬–২৭ বাজেটের সবচেয়ে গভীর আদর্শগত পরিবর্তন হলো উচ্চশিক্ষাকে সরাসরি ‘Education to Employment’ কাঠামোয় ফেলা। একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি ঠিক করবে কোন দক্ষতার চাহিদা বেশি, সেই অনুযায়ী সিলেবাস বদলাবে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির ঝুঁকি সুদূরপ্রসারী। মানববিদ্যা, সমাজবিজ্ঞান, মৌলিক বিজ্ঞান— যাদের ফল তাত্ক্ষণিক নয়— তারা কি প্রান্তিক হয়ে পড়বে? বিশ্ববিদ্যালয় কি চিন্তার মুক্ত ক্ষেত্র না হয়ে কেবল প্লেসমেন্ট এজেন্সিতে পরিণত হবে?
বিশ্ববিদ্যালয় টাউনশিপ: শিক্ষা না রিয়েল এস্টেট?
শিল্প করিডরের পাশে পাঁচটি University Township গড়ার পরিকল্পনা প্রথম দর্শনে আকর্ষণীয়। সরকারি জমি ও বেসরকারি বিনিয়োগের যৌথ মডেল। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, এই ধরনের প্রকল্পে ফি বাড়ে, ক্যাম্পাস হয়ে ওঠে অভিজাত, এবং শিক্ষার চেয়ে জমির মূল্যবৃদ্ধি বড় হয়ে দাঁড়ায়।
শিক্ষা যদি নাগরিক অধিকার হয়, তবে তার ঠিকানা কি শুধুই রিয়েল এস্টেটের মানচিত্রে আঁকা হবে?
অনুদান থেকে ভাউচার: বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ সংকট
ইঙ্গিত স্পষ্ট— প্রতিষ্ঠানভিত্তিক অনুদানের বদলে ছাত্রভিত্তিক ভাউচার বা স্কলারশিপ। এর ঝুঁকি গভীর। জনপ্রিয় ও বাজারমুখী কোর্স টিকে থাকবে, মৌলিক ও কম চাহিদাসম্পন্ন বিষয় হারিয়ে যাবে।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়িত্ব, বৈচিত্র্য এবং স্বায়ত্তশাসন— তিনটিই প্রশ্নের মুখে।
গবেষণা: প্রচারের আলো, বরাদ্দের ছায়া
ANRF-এর জন্য ঘোষিত ৫০,০০০ কোটি টাকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে এসে দাঁড়ায় মাত্র কয়েক হাজার কোটিতে। বাকিটা আসবে বেসরকারি খাত থেকে— যা ভারতের বাস্তবতায় প্রায় অলীক কল্পনা।
PM Research Chair প্রকল্পে বরাদ্দ সীমিত, যখন হাজার হাজার গবেষক দেশ ছাড়ছেন। ল্যাব, যন্ত্রপাতি, ফেলোশিপ— সবই সংকটে। মৌলিক বিজ্ঞান, ভাষা ও তাত্ত্বিক গবেষণা ক্রমশ কোণঠাসা।
‘অরেঞ্জ ইকোনমি’: সৃজন না গিগ-ফাঁদ?
কনটেন্ট ল্যাব মানেই সৃষ্টিশীল অর্থনীতি— এই ধারণা মোহময়। কিন্তু বাস্তবে এটি বহু ক্ষেত্রে অনিশ্চিত গিগ-ওয়ার্কে ঠেলে দেয় তরুণদের। প্রশ্ন ওঠে— রাষ্ট্র কি স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের দায় থেকে সরে যাচ্ছে?
কেন্দ্র–রাজ্য সংঘাতের শ্রেণিকক্ষীয় প্রভাব
PM-SHRI চুক্তিকে কেন্দ্র করে কেন্দ্র ও রাজ্যের সংঘাতের খেসারত দিচ্ছে স্কুল। সমগ্র শিক্ষা প্রকল্পের টাকা আটকে যাওয়ায় বহু জায়গায় শিক্ষকের বেতন দেরি, পরিকাঠামো সংকট, শিক্ষাবর্ষে অস্থিরতা।
শিক্ষা যখন রাজনৈতিক দরকষাকষির অস্ত্র হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুর ভবিষ্যৎ।
বাজেটের বাইরে থাকা মানুষ
এই বাজেটের পাতায় অনুপস্থিত ছাত্রের কথা— যাদের ফি বাড়ছে, ফেলোশিপ অনিয়মিত। অনুপস্থিত শিক্ষকের কথা— লক্ষ লক্ষ শূন্যপদ, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, স্বাধীনতার অভাব। অনুপস্থিত গবেষকের কথা— যাদের জন্য ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
শেষ প্রশ্ন: শিক্ষা কি কেবল রুজির উপকরণ?
২০২৬–২৭-এর শিক্ষা বাজেট শিল্পের দরজা খুলেছে, পরিকাঠামো বানাচ্ছে, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে। কিন্তু প্রান্তিক ছাত্র, সাধারণ শিক্ষক, মৌলিক জ্ঞান— তারা ক্রমশ প্রান্তে।
এই বাজেট একটাই কথা স্পষ্ট করে— শিক্ষার উদ্দেশ্য আর জীবন গড়া নয়, জীবিকা তৈরি। প্রশ্ন হলো, জীবিকা থাকলেই কি জীবন সম্পূর্ণ হয়? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে ‘বিকশিত ভারত’ কেমন হবে— চিন্তাশীল নাগরিকের দেশ, না দক্ষ কিন্তু অনিশ্চিত ভবিষ্যতের এক বিশাল কর্মশক্তি।
উত্তর এখনও অমীমাংসিত।




Add comment