
AI অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আজ বিশ্বজুড়ে প্রায় প্রত্যেক প্রান্তেই চর্চা হচ্ছে প্রচুর। কেউ কেউ আতঙ্কে রয়েছে তার, আবার কেউবা আশায় বুক বাঁধছে তাকে কাজে লাগানোর জন্য। কিন্তু আরও একটি জিনিস নিয়ে আশঙ্কায় ভুগছে মূলত পশ্চিমী দুনিয়া। মানবজাতির সার্বিক উন্নয়ন, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি, গণতন্ত্রীকরণ, শক্তিশালী অর্থনীতি, ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং লিঙ্গ সমানতার উপর ভর করে আজ জাপান, ইতালি থেকে শুরু করে মেক্সিকো ও অস্ট্রেলিয়া প্রায় সব দেশেই জন্মহার ক্রমশ পরতির দিকে। বিভিন্ন দেশে তাই মৃত্যুহার ছাপিয়ে গেছে জন্মহারকেও এবং কমতে শুরু করেছে মোট জনসংখ্যা।
জনসংখ্যার এহেন অবস্থায় এমনতর দেশগুলি আর্থিক প্রগতি এবং সমৃদ্ধি রক্ষায় তাই ভর করেছে অভিবাসী শ্রমিকের উপর। এবং মজার ব্যাপার হল আমাদের দেশ ভারত যা বর্তমানে বিশ্বের সবথেকে জনবহুল রাষ্ট্র উঠে এসেছে শ্রম রপ্তানির এই ব্যবসার বড়ো অংশীদারি হিসেবে। অভিজ্ঞ, অনভিজ্ঞ, যুব, বয়স্ক তাই দেশ ছেড়ে পাড়ি দিচ্ছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। কাতার, কুয়েতের মতো দেশে যেমন ইমারতি শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে এ দেশের জনগণ তেমনি জার্মানি, কানাডায় খাবার ডেলিভারি করার লোকের বড়ো অংশও আজ ভারতীয়। কিছু নির্দিষ্ট সময় সেখানে থাকলে মিলে যাচ্ছে নাগরিকত্ব বিভিন্ন দেশের তাই শ্রম জীবন শেষ হওয়ার পরেও ভারতে ফিরছে না তার এই সব নাগরিক দল।
কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সমস্যাটা দাঁড়িয়ে অন্য জায়গায়। দেশে লোক নেই বলে বাইরে থেকে আসা এত শ্রমিকের উপস্থিতি মেনে নিতে পারছে না সেই সব দেশের অনেক নাগরিকই। তাই বাইরে থেকে আসার শ্রমিকদের মাঝেসাঝেই মুখোমুখি হতে হচ্ছে স্থানীয় জনগণের অত্যাচার এবং বর্ণবিদ্বেষের, কোথাও বা সরকারি বন্ধ করে দিচ্ছে তাদের অভিবাসনের রাস্তা। উদাহরণস্বরূপ ইতালি, আমেরিকা, নেদারল্যান্ডসের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। আবার অন্যদিকে ভারত, ফিলিপিন্সের মতন দেশের জাতীয়তাবাদী সরকারও চাইছে না রাষ্ট্র থেকে এই বিপুল পরিমাণ শ্রমিকের নিষ্কাশন।
উন্নত এইসব দেশের কাছে তাই এখন বড়ো প্রশ্ন কম মানুষ দিয়ে কিভাবে ধরে রাখা যায় আগের সেই আর্থিক সমৃদ্ধি? হাঙ্গেরি কিংবা ফ্রান্সের মতন দেশ যেমন চেষ্টা করছে জন্মহার বাড়ানোর। পিতা মাতার মাতৃকালীন ছুটি, কাজের জায়গায় সুবিধা, পরিবার শুরু করলে কিছু সরকারি আর্থিক সহায়তা, এই সমস্ত দিয়ে চেষ্টা করা হচ্ছে জন্মহার বজায় রাখবার। আবার দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতন দেশ সেই সমস্ত নীতি প্রণয়নে ব্যর্থ হয় ঝুঁকেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে। রোবট তথা যন্ত্রমানব তাই ক্রমশ বাজারে দোকানে অফিসে নিয়ে নিচ্ছে মানবের জায়গা। হোটেল রেস্টুরেন্টে গেলে তাই ওয়েটার আর কোনও মানব বা মানবী নয়, বরং এক চলমান রোবট। অফিসের ডেস্কে কম্পিউটারের সামনে তাই বসে থাকতে হয় না আর কাউকে বরং অফিসে কোনও ডেস্কি নেই আর। থাকবে কেন? রোবটকে যে আর বসে কাজ করতে হয় না।
একজন ভারতীয় হিসেবে এই সমস্ত তথ্য শুনে হয়তো বেশ আতঙ্ক লাগবে আপনার। লাগারই কথা। এ দেশের ১৪০ কোটি মানুষ যে এখনও চাকরির জন্য হাহাকার করে, সেখানে এই যন্ত্র মানব তাহলে কি প্রভাব ফেলবে ভবিষ্যতের দিনে? কিন্তু মজা জিনিসটা হলো ভারতের এই ভিড়ে দাঁড়িয়ে, ঠিক বুঝতে না পারলেও তথ্য বলছে জন্মহার কমছে এদেশেও। আর্থিক বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মেয়েদের পড়াশোনার উপর সরকারি জোর এবং শহুরে জনসংখ্যার বৃদ্ধি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনছে ভারতের জন্মহার। হয়তো ইতালি কিংবা জাপানের পর্যায়ে এখনো পৌঁছয়নি ভারত এবং বিপুল জনসংখ্যার মাঝে বসে হয়তো সেটা বোঝাও যাবে না সহজে। কিন্তু আগামী দিনের ভবিষ্যতে ভারতেও কিন্তু কমবে যুবক-যুবতী, তরুণ-তরুণীর সংখ্যা। পরিবার ছোটো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আসবে, দেশের আর্থিক বৃদ্ধির হারের কমার আশঙ্কাও। ভারত থেকে কাজের খোঁজে তাই বাইরে যাওয়া তখন হয়ে উঠবে একটি রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রশ্ন, যখন টান পড়বে এদেশের নিজস্ব শ্রমিক জনতারও।
তাই হয়তো মানবজাতির ভবিষ্যত তৈরি হবে অমানব যন্দ্র মানুষের হাত ধরেই। কারণ কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় হয়তো ঠিকই বলেছিলেন, “মানুষ বড়ো একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।” দিনের শেষে হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই হয়ে উঠবে মানুষের একমাত্র সঙ্গী।




Add comment