Edinbox Bengali
ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং Brain Drain

ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং Brain Drain

ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং Brain Drain

শিক্ষা এবং চাকরির বাজার যে যে কোনও দেশের প্রবাসন এবং অভিবাসনের মূল কারণ তা আশা করি আপনারা জানেন প্রায় সকলেই। সেই জন্যেই গোটা বিশ্বজুড়ে আমরা দেখি মানবজাতির পরিব্রাজন; গরিব থেকে ধনী, অনুন্নত থেকে উন্নত এবং বিপজ্জনক থেকে সুরক্ষিত সমাজ এবং রাষ্ট্রের দিকে। অর্থাৎ খারাপতর জায়গা থেকে ভালোতর জায়গায় স্থানান্তরিত হওয়ার প্রবৃত্তি মানুষের জন্মগত এবং তাতে কোনও বিশ্বাস, স্বার্থ এবং ভাবনায় আঘাত নেহাতই কাকতালীয়। তার মানে এটাও যে বহু ভারতীয় যারা জাতীয়তাবাদের প্রতি ঝোঁকেন এবং দেশে ছেড়ে বিদেশে চাকরি অথবা শিক্ষার খোঁজে যাওয়াকে খারাপ চোখে দেখেন তারা এটা ভুলে যান যে জীবনে উন্নতি করবার প্রবৃত্তি মানুষের মনে বাইরে থেকে প্রবেশ করানো হয় না; বরং তা জিনগতই বলা চলে।

অন্তদেশীয় অভিবাসন:

যদি আমরা জিনিসটাকে আরো ক্ষুদ্রতর জায়গায় দেখি তাহলে এটাও চাক্ষুষ হয় যে বহু ভারতীয় নিজেদের দেশেই অনুন্নত জায়গা থেকে উন্নততর জায়গায় পরিব্রাজন করছেন। ভারত বৃহৎ দেশ, তাই এখানের বিভিন্ন অঞ্চলের অনন্য আর্থসামাজিক বহু ধরনের সমাজ এবং স্থিতি চোখে পড়বে যে কোনও মানুষেরই। গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে আরও বড়ো শহরে, শহরতলী থেকে শহরে, পশ্চাৎভূমি থেকে উপকূলে, পাহাড়ি অঞ্চল থেকে সমতলে, মানুষের অভিবাসন ভারতের মধ্যেও যথেষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষা, জীবিকা এবং আরও নানান অন্যান্য কারণে মানুষ বহু প্রাচীনকাল ধরেই এক অঞ্চল থেকে অন্যান্য অঞ্চলে অভিবাসন করে এসেছে। এবং মজার ব্যাপার হল আমরা বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর মধ্যেও এই রীতিনীতি চাক্ষুষ করতে পারি। মানুষের মধ্যেও কৃষিকাজ এবং পশুপালনের উদ্ভাবনের আগে যাযাবর জীবনে ছিল মূল ভরসা। যা শুনে হয়তো এখনকার দিনের জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমী অনেক মানুষই অবাক হবেন। অর্থাৎ আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগেও দেশ বলে মানুষের কোনও ধারণা ছিল না কারণ নির্দিষ্ট ভূমির ওপর স্থায়িত্ব এবং সেখানে বসতি করে তোলার ইচ্ছা বা প্রবৃত্তি কোনটাই আমাদের প্রজাতির মধ্যে আসেনি তখনও।

আন্তদেশীয় অভিবাসন:

বর্তমানের বৈশ্বিক জাতীয়তাবাদী যুগে এই আন্তর্দেশীয় অভিবাসনই হয়ে উঠেছে বিতর্ক এবং সমালোচনার মূল কারণ। অর্থাৎ এক দিক থেকে অন্য দেশে মানুষের যাতায়াত এবং প্রবেশের অধিকার এবং কারণ হয়ে উঠেছে এক রাজনৈতিক বিষয়, অর্থনৈতিক নয়। বিশ্বে বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন দেশের সরকার তাই নিজস্ব ধর্ম, ভাবধারা, ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস আদর্শ ধরে রাখা এবং সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন রকম ভাবে অভিবাসন এবং পরিব্রাজনের উপর বাধা সৃষ্টিতে নিয়োজিত হয়েছে। এর সব থেকে ভালো উদাহরণ আমরা দেখতে পাই পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে। যেখানে চিন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ানের মতন বিভিন্ন দেশ জন্মহার হ্রাসের ফলে ক্রমশ জনসংখ্যাও হ্রাসের দিকে এগোচ্ছে, অথচ নিজেদের সমাজ সংস্কৃতি ধরে রাখার উদ্দেশ্যে এখনো সেই সব রাজ্যে অভিবাসনের হার তুলনামূলকভাবে খুবই কম, যদিও তা সে সব রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিপরীত চিন্তাধারা হিসেবে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে আবার আমরা দেখতে পাই পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশ যারা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ব্যাপক হারে অভিবাসনকে স্বীকৃতি দিয়েছে, যেমন কাতার, কুয়েত, বাহারিন, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ও ওমান। অর্থাৎ গোটা বিশ্বজুড়েই আমরা দেখতে পাই অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন দেশের সরকার বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জন্মহার হ্রাসের ফলে জনসংখ্যা হ্রাস কমাতে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি থেকে শ্রমিক এবং কর্মী এবং শিক্ষার্থী নিয়োগের বন্দোবস্ত করেছে। অর্থাৎ পূর্ব ইউরোপের পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, ইউক্রেনের মতন দেশগুলি থেকে বহু মানুষ জীবন এবং জীবিকার খোঁজে পশ্চিম ইউরোপের ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও স্পেনের মতন দেশে পরিব্রাজন করে।

ভারতের মতন বিশাল রাষ্ট্র যা বর্তমানে বিশ্বে সব থেকে জনবহুল দেশ, এখানে অন্তদেশীয় এবং আন্তর্জাতীয় দুই ধরনের পরিব্রাজনে ব্যাপকভাবে ঘটে থাকে। ভারতে এই ব্যাপকহারে অভিবাসনের মাত্রা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, পশ্চিম এশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইউরোপ, পূর্ব আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তে শক্তিশালী ভারতীয় সমাজ এবং সংস্কৃতি গড়ে তুলতে যথেষ্ট সহায়তা করেছে। এই ধরনের অভিবাসনের মূল কারণ বেশিরভাগ সময়ই শিক্ষা অথবা জীবিকা। কিন্তু বর্তমানে ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জাতীয়তাবাদী সরকার এবং নেতৃবৃন্দ এই ধরনের অভিবাসনের বিরোধিতা করা শুরু করে দিয়েছে এবং বিভিন্নভাবে তা প্রতিরোধ করারও চেষ্টা করা হচ্ছে। 

একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসাবে ভারতের জনগণ স্বাভাবিকভাবেই উন্নততর শিক্ষা এবং জীবিকা সংস্থানের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পশ্চিমী দেশে পাড়ি দেয়। কিন্তু ভারত সরকারের মতে এরফলে দেশের আর্থিক বিকাশ এবং উন্নতির ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হয়। ভবিষ্যতে যাতে ভারত আরও উন্নততর হতে পারে সেই জন্য ভারতে দক্ষ শ্রমিক এবং বিশেষ করে বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতি একান্তই প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বিদেশে পড়াশোনা কিংবা চাকরির উদ্দেশ্যে যাওয়া ভারতীয় প্রবাসীদের দেশে ফিরিয়ে আনবারও নানান ধরনের চেষ্টা শুরু করেছে আজকের সরকার। এই ধরনের মানুষ দেশে থেকে সেখানকার অর্থনীতি এবং সমাজে অবদান দিলে রাষ্ট্রে আরও প্রগতি হবে বলেই বিভিন্ন মহলের বিশ্বাস।

আন্তদেশীয় অভিব্রাজন এবং সংস্কৃতির সংঘর্ষ: 

বিশ্বায়নের ফলে পৃথিবীর যত ছোটো হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ততই সহজে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত এবং যোগাযোগের মাত্রা বাড়িয়েছে। ফলে একসময় বিপরীতধর্মী এবং সংঘর্ষজাত আচার-আচরণ একে অপরের থেকে দূরত্বের সীমানা বজায় রেখে অবস্থান করত তা ক্রমশ একে অপরের কাছাকাছি চলে আসছে। বিভিন্ন ধর্মের এবং ভাষাভাষী মানুষ যখন একে অপরের সংস্পর্শে আসছে তখন আন্তঃসংস্কৃতিক যোগাযোগ যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে বিদ্বেষ এবং সংঘর্ষের আশঙ্কা। এর একটি অন্যতম উদাহরণ আমরা দেখতে পাই। ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টেলে ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় এবং পাকিস্তানিদের অভিবাসীদের সংঘর্ষ, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তে লাটিন আমেরিকা থেকে আগত শরণার্থীদের সঙ্গে পূর্ব বাসিন্দাদের বিরোধ। অর্থাৎ অভিবাসন এবং পরিব্রাজন যেমন সংস্কৃতির বিকাশে সাহায্য করেছে তেমনি ফুটে তুলেছে মানুষের মনের উগ্রতাকেও।

ভারতের মতন উন্নয়নশীল দেশ যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জীবিকার দিক থেকে বিশ্বের অনেক প্রান্তে থেকেই অনেক পিছিয়ে সে দেশের মানুষ যে অন্য উন্নততর দেশে অভিবাসন করতে চায় তাই নিয়ে অবাক হওয়ার মতন কিছু নেই। বরং তা মানুষের এক আদিম প্রবৃত্তি। কিন্তু দিনের শেষে এও স্বীকারিকার্য যে শিক্ষা এবং জীবিকার টানে যাওয়া জনগণ দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই বিকশিত ভারতের স্বপ্ন নিয়ে দেশের উন্নতির প্রতি এগিয়ে যেতে হলে ভারতের এই বিপুল জনসংখ্যাকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সাধন করতেই হবে নাচেৎ ভারতের জনসাধারণ ক্রমশই স্বদেশ উন্নতির বদলে উন্নত বিদেশকেই স্বদেশ হিসেবে বেছে নেবে।

এডিনবক্স টিম

Add comment

Most popular