
খবরের কাগজ, টিভি, সোস্যাল মিডিয়া এমনকি রাস্তায় বেরোলেও এই কথাটা মাঝে মাঝে শোনা যায় এখন। কমবয়সীরা নাকি এখন খুব বিক্ষুব্ধ; সমাজের প্রতি, সরকারের প্রতি, প্রতিষ্ঠানের প্রতি। মার্কিন দেশের ভাষায় এই নতুন কমবয়সী Gen Z প্রজন্ম তাই রাস্তায় বেরিয়ে জানান দিচ্ছে তাদের ক্ষোভের আগুনের। বিশ্বজুড়ে নানা দেশের উল্টে দিচ্ছে সরকার, রাস্তায় জ্বালাচ্ছে টায়ার আর লড়ছে সরকারি পুলিশের সঙ্গে, এই নতুন যুবা রক্তস্রোত। প্রতিবাদের ধরন যদিও নানা দেশে নানা রকম, সব জায়গায় যে সফল হচ্ছে তাদের আন্দোলন তাও নয়। নেপাল আর মাদাগাস্কারের মতন দেশে যখন সেনাবাহিনী এসে পাশে দাঁড়িয়েছে তাদের দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রপতিও, আবার অন্যদিকে তুরষ্কে পুলিশের হাতে শেষ অবধি দমিত হয়েছে তাদের নৈতিক আন্দোলন। তবে হ্যাঁ, একবিংশ শতাব্দীর এই দ্বিতীয় দশকে যেন উঠে এসেছে এমন এক আন্দোলন যা তোলপাড় করছে দেশ, ধর্ম, বর্ণ ব্যাতিত গোটা বিশ্বকেই।
তা এখন প্রশ্নটা হল হঠাৎ করে এই কম বয়সী Gen Z দের মাথায় এরকম আকাশ ভেঙ্গে পড়লো কি করে? মায়ের কোল আর বাবার আদর ছেড়ে হঠাৎ কেন দিকে দিকে রাস্তায় নামছে তারা? আর দিনের শেষে তারা চায়টা কি?
Generation Gap আর ক্ষমতা:
আচ্ছা বলুন দেখি, ভারতের কটা রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রীর বয়স কুড়ির দশকে? একটাও না। ত্রিশ? না, তাও নেই। বর্তমানে ভারতের সব থেকে কম বয়সী মুখ্যমন্ত্রী হলেন অরুনাচল প্রদেশের পেমা খান্ডু, বয়স ৪৬ বছর। প্রধানমন্ত্রীর বয়স ৭৫ বছর। তাই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ জনগণ, এ দেশে যাদের গড় বয়স বর্তমানে মাত্র ২৮ বছর; তাদের মধ্যের বিভেদ বাড়ছে বৈকি। চিন্তাভাবনা, রীতিনীতি, সংস্কৃতির বিচারের তরুণ প্রজন্ম এখন ইন্টারনেটের এই যুগে আগের তুলনায় অনেক বেশি সাবলীল, সচেতন এবং আত্মবিশ্বাসী। তাই এই ফারাক যাকে Generation Gap ও বলা চলে, ক্রমশ ক্রমবর্ধমান। যা এই আন্দোলনের এক মূল জ্বালানি।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ছবিটা অনেকটা একই রকমের। বিশ্বের কুড়িটি বৃহত্তম দেশের মধ্যে পনেরোই বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে সত্তরোর্ধ বয়সীদের দ্বারা। অথচ সত্তরোর্ধ গড় বয়সীদের কোনও দেশ এখনও নেই এই বিশ্বের বুকে। বিশ্বজুড়ে এই Trend এর কারণটা অবশ্য নানা দেশে ভিন্ন। যেখানে চিন, রাশিয়ার মতো দেশ ভুগছে স্বৈরাচারবাদে আর শাসকদের নাছোড়বান্দা মানসিকতায়, অন্যদিকে ভারত, আমেরিকার মতো দেশের সমস্যা কঠোর প্রাতিষ্ঠানিকতাবাদ ও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার ঢেউ, যা কেবল একক ব্যক্তির আধারেই সীমাবদ্ধ। তাই গণতন্ত্র থেকে স্বৈরতন্ত্র, মাটি কামড়ে পড়ে নেতাদের সহজ উপায়ে গদি ছাড়া করা সত্যিই কঠিন।
প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি দুর্নীতি:
দুর্নীতির সমস্যা, বিশেষত সরকারি ক্ষেত্রে আজ নতুন কোনও ব্যাপার নয়। গোটা বিশ্ব জুড়ে প্রায় সব দেশেই এবং চিরকালই এই সমস্যা বহমান। তবে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ফারাকটা হয়েছে অন্য জায়গায়। সোশ্যাল মিডিয়া, ইন্টারনেটের সরকারি নোংরা দুর্নীতির এই তথ্য এবং প্রমাণ ছড়ানো যায় খুব তাড়াতাড়ি বহুদূরে, এক দেশ থেকে অন্য দেশেও। তাই বিভিন্ন দেশে প্রাতিষ্ঠানিক এবং সরকারি ক্ষেত্রে দুর্নীতির আকার এবং গভীরতা খুব সহজেই অগোচর হয় সাধারণ জনগণের। যেমন শ্রীলঙ্কার রাজাপক্ষ ভাইদের শাসনের সময় বিদেশ থেকে আসা দেশের উন্নতির টাকা যে গায়েব হচ্ছে এবং কারা তার পেছনে যুক্ত তা জানতে সে দেশের মানুষদের একটা মোবাইল ফোন থাকাটাই যথেষ্ট ছিল। তেমনই ওশিয়ানিয়ার পাপুয়া নিউ গিনিতে শিক্ষাখাতের খরচ কমিয়ে তা দিয়ে পার্লামেন্টের সাংসদদের জন্য নতুন গাড়ি কেনা হচ্ছে সে খবর রটতেও দেরি হয়নি বেশি।
দুর্নীতির মুখোশ এত সহজে কোনও প্রজন্ম নয় আজ অব্দি খুলতে পারেনি কোনও সরকার বা প্রতিষ্ঠানের মুখ থেকে। তাই আজকের তথ্য নির্ভরতার যুগে তথ্যই আজ অস্ত্র হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের, সাধারণ ছেলেমেয়েদের, সাধারণ জনগণের হাতিয়ার। এই অস্ত্রেই তারা তৈরি করছে জনমত এবং এগিয়ে আসছে পরিবর্তনের লক্ষে।
অর্থনীতি ও চাকরির বাজার:
বিশ্ব ব্যাঙ্কের মতে প্রতি বছর বৈশ্বিক অর্থনীতির বৃদ্ধির হার দুই শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উৎপাদন এবং ব্যয় বৃদ্ধি হচ্ছে কমবেশি গোটা দুনিয়ার সব দেশেই। কিন্তু বিশ্বের বাজারে বৃদ্ধির হার সব জায়গায় সমান নয় এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধি হলেও সাধারণ কমবয়সী যুবাবৃন্দের কাছে চাকরি পাওয়া এবং চাকরি পেলেও মূল্যবৃদ্ধির গেরোয় ফেঁসে হাঁসফাঁস করার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে ফ্রান্স থেকে চিলে, লেবানন থেকে নাইজেরিয়া প্রায় সব দেশেই। অর্থনৈতিক বিরূপ পরিস্থিতির জন্য সরকার সব সময় দায়ী না হলেও তা নিরাময়ের জন্য কোনও ব্যবস্থা না নিলে তার দায় শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সরকারের ঘাড়েই।
কোভিড পরবর্তী যুগে আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন কমেছে, তেমনই কমেছে বৈশ্বিক বাজারের উপর অতিনির্ভরতাও। তাই কোনও নির্দিষ্ট দেশের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দায় সে দেশের সরকারও আর ঠেলে দিতে পারে না আগের মতন, অন্যের উপর। এছাড়াও বিশ্বের নানা প্রান্তে যুদ্ধবিগ্রহ এবং সামরিক প্রস্তুতিও বাড়িয়েছে আর্থিক বাজারে বিভিন্ন শঙ্কা, তাই এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন জাতীয় সরকারের ক্ষেত্রেও অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখা ক্রমশ হয়ে উঠছে কঠিন। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব গিয়ে পড়ছে তরুণ সমাজের চাকরির বাজারেও।
বিশ্বায়ন ও ইন্টারনেট:
বর্তমান দিনে যোগাযোগ ব্যবস্থা যে অতীতে তুলনায় অনেকেই সরল এবং স্বচ্ছল তা আশা করি বলে দিতে হয় না। ইন্টারনেটে জালে আজ বাঁধা পড়েছে গোটা বিশ্বের সব দেশই। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সাধারণ মানুষের যোগাযোগ আগে তুলনায় বেড়েছে বহুগুণ, বেড়েছে তথ্যের আদানপ্রদান, সাংস্কৃতি যোগাযোগ এবং চিন্তাভাবনার স্বাধীনতা। আর এই চিন্তাভাবনাই করে তুলেছে এই প্রজন্মকে সমাজ নির্মাণের এক শক্তিশালী স্তম্ভ। যেহেতু আজ বিশ্বের যে কোনও প্রান্তের মানুষ বিশ্বের অন্যান্য অংশে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে ওয়াকিবহাল থাকতে পারে, তাই এক দেশের আন্দোলন ক্রমশ প্রভাবিত করছে সেই দেশের জাতীয় গণ্ডি পেরিয়েও। যেমন ২০১১ সালে হওয়া তিউনিশিয়ার আন্দোলন, যা পরে মিশর, আলজেরিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া, বাহারিন, মরক্কো, সুদানকেও প্রভাবিত করে এবং গোটা আরব বিশ্বজুড়ে আরব বসন্তের সূচনা করে। ভারতের আশেপাশে আমরা দেখি কিভাবে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল, মায়ানমারে একের পর এক গণঅভ্যুত্থানের ফলস্বরূপ পতিত হয় সরকার এবং যার শীর্ষ নেতৃত্বে বর্তমানে রয়েছে যুব সম্প্রদায়ই।
তাই দিনের শেষে আমরা দেখি যে কিভাবে বর্তমানের প্রযুক্তি বিশেষ করে যোগাযোগ মাধ্যম গণ যোগাযোগের এক বিস্তৃত রাস্তা খুলে দিয়েছে, যা ব্যবহার করে বর্তমান যুব সম্প্রদায় এই আন্দোলনে নেতৃত্ব এবং সফল সমাধান করতে সক্ষম হচ্ছে গোটা বিশ্বজুড়েই। একদা স্বৈরাচারী এবং প্রাতিষ্ঠানিক দেশেও তাই জাগছে আশার আলো এবং পুরাতনকে সরিয়ে নবীনের আগমনের আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছে পুরোদমে।
বিবিধ:
উপরিউক্ত কারণগুলো ছাড়াও এই বিশ্বব্যাপী আন্দোলনের পিছনে রয়েছে আরও অনেক কারণ। সব দেশের পরিস্থিতি সমান নয়, সমান নয় সমস্যার ধরনও। প্রত্যেক দেশের যুব সম্প্রদায় লড়ছে তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব আলাদা দাবি-দাওয়ার স্বার্থে। কিছু ক্ষেত্রে সেগুলি এক হলেও অনেক ক্ষেত্রেই দাবিগুলো আলাদা। লেবাননের যুবকেরা ভবিষ্যতে পাওয়া পেনশনের দাবিতে লড়ে না, কারণ তাদের কাছে বর্তমানে করার মতন চাকরিটুকুও নেই; যা আবার ফ্রান্সের যুবকবৃন্দের কাছে পথে নামার অন্যতম কারণ। মেক্সিকোর জনগণ ক্ষুব্ধ দেশ জুড়ে অপরাধের বাড়বাড়ন্ত আর সরকারি দুর্বলতার প্রতি, আবার তুরষ্কের মানুষ আজ রাস্তায় কারণ সরকারি অতি সক্রিয়তা এবং বিরোধী দমনপীড়ন। তাই বিশ্বজুড়ে হওয়া এই বিশাল গণআন্দোলন যে সব একই রকম, একই কারণের উপর নির্ভরশীল এবং একই ছাঁচে ঢালা তা কিন্তু নয়। আন্দোলনের কারণ এবং লক্ষ্য অনেক দেশেই ঠিক করে দিচ্ছে তাদের ফলাফল। বৃহত্তর সমাজ এবং জনগণ ছাত্রবৃন্দ এবং যুবকবৃন্দের পাশে এসে দাঁড়ালে যে সফল হচ্ছে আন্দোলন তার উদাহরণ আমরা দেখেছি কেনিয়া থেকে ইন্দোনেশিয়া, পেরু থেকে মরোক্কো অব্দিও।
তবে হ্যাঁ, এটা মানতেই হবে যে আন্দোলনের কারণ যাই হোক না কেন এবং ফলাফল আলাদা হলেও মূল চালিকাশক্তি হিসেবে সক্রিয় রয়েছে যুবকবৃন্দই, প্রায় সব দেশেই। আন্দোলনের গঠন, লোকবল, প্রচার এবং জনমত সংগঠন করার মতন মূল ভূমিকার দায়িত্ব নিতে দেখা যাচ্ছে কম বয়সী Gen Z কেই। এক্ষেত্রে আজ তাদের মূল হাতিয়ার ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়া। চিন, ইরানের মতো স্বৈরাচারী দেশের শাসকদল তাই নিজেদের দেশে ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি কিভাবে বন্ধ কিংবা নিয়ন্ত্রণ করা যায় তার ওপরে নজর দিতে শুরু করেছে এখন। এর থেকেই বোঝা যায় যে কোনও ধরনের গণআন্দোলনের পিছনে কত বড়ো ভূমিকা নিয়ে থাকে এই ধরনের মাধ্যমগুলি। সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা খর্ব করে নিজেদের ক্ষমতা সুরক্ষিত করবার এই অভিপ্রায় দেখা যাচ্ছে বিশ্বের আরও বিভিন্ন প্রান্তের শাসক গোষ্ঠীতেও। তাই খাঁচার পাখি খাঁচায় রাখার সব থেকে সুরক্ষিত উপায় হল তাকে আকাশ দেখতে না দেওয়া, এই পন্থাতেই পরিচালিত হচ্ছে এই ধরনের স্বৈরাচারী শাসন গোষ্ঠীগুলির মানসিকতা। যা উপড়ে ফেলার জন্যই আজকের এই বৈশ্বিক আন্দোলনের জন্ম। এবং একতাই যে সাফল্যের চাবিকাঠি, তাও প্রমাণিত হয়েছে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে এই ব্যাপক লড়াইয়ে।
ইতালি, মেক্সিকো, ফিলিপিন্স, ইরান দেশগুলি কাছাকাছি নয় মোটেও। অথচ যুব আন্দোলনের ঢেউ আজ দূরকে করেছে নিকট। দুর্নীতিগ্রস্ত, অক্ষম, অসংবেদনশীল এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গিয়ে আজকের যুব আন্দোলন বা Gen Z Protest এর মূল মন্ত্রই হল একতা, সুবিচার, সুশাসন ও স্বাধীন চিন্তাভাবনা করবার অধিকার অর্জন। কোথাও সফল হচ্ছে তা, কোথাও বা ক্ষমতার চাপে দমিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের। কোনও দেশে নারীরা বাধ্য হচ্ছে ধর্মীয় ক্ষমতার চাপে মুখ ঢাকতে, অন্যায় দেখে চুপ করে থাকতে; আবার কোনও দেশে বৃহত্তর সমাজ পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে যুব সম্প্রদায়ের, ক্ষমতার শিকল ভাঙতে, দুর্নীতির ছাপ মুছতে এবং সমান সমাজ গড়তে।
তাই যুবা রক্ত বইবে, আন্দোলন চলবে, ক্ষমতা ভাঙবে আর গড়েও উঠবে আবার নতুন রূপে। Gen Z আন্দোলনের বর্তমান গণজোয়ার তাই শতাব্দপ্রাচীন সেই সংগ্ৰামেরই এক নতুন ঢেউ।
– কল্পেশ মান্না




Add comment