Edinbox Bengali

যখন পৃথিবী জ্বলে ওঠে, ক্যাম্পাসও কেঁপে ওঠে

কেন যুদ্ধ, তাপপ্রবাহ, অর্থচাপ, অভিবাসন-ধাক্কা, মানসিক ক্লান্তি এবং এআই আজ ভারতের উচ্চশিক্ষাকে নতুনভাবে বদলে দিচ্ছে

একটা সময় ছিল, যখন মানুষ বিশ্বাস করতে ভালোবাসত যে বিশ্ববিদ্যালয় যেন ইতিহাসের উত্তাপ থেকে একটু ওপরে দাঁড়িয়ে থাকে।

বাইরে মন্দা থাকতে পারে, নির্বাচন-ঝড় থাকতে পারে, সামাজিক অস্থিরতাও থাকতে পারে, তবু মনে করা হতো—ক্যাম্পাসের ভেতরে জীবন যেন নিজের ছন্দে চলতেই থাকবে। তরুণ-তরুণীরা ব্যাগ কাঁধে ক্লাসে যাবে, অপূর্ণ স্বপ্ন নিয়ে পথ হাঁটবে। অধ্যাপকরা আকাশপথ বন্ধ হওয়া নিয়ে নয়, ভাবনা আর তত্ত্ব নিয়ে তর্ক করবেন। লাইব্রেরি খোলা থাকবে। ল্যাবরেটরি চলবে। হোস্টেলে রাত জেগে চলবে ক্যারিয়ার, সিনেমা, রাজনীতি আর প্রেম নিয়ে অন্তহীন আড্ডা।

সেই ছবিটা এখনও ব্রোশিওরে আছে। বাস্তবে আর নেই।

আজ উচ্চশিক্ষা এমন এক সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যাকে গবেষকেরা বলেন পলিক্রাইসিস—অর্থাৎ একটিমাত্র সংকট নয়, একসঙ্গে বহু সংকটের আগমন। তারা একে অন্যের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে, একে অন্যকে বাড়িয়ে তুলছে, আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে এমন সব সমস্যার ধাক্কা সামলাতে বাধ্য করছে, যেগুলি তারা নিজেরা তৈরি করেনি। যুদ্ধ আন্তর্জাতিক ছাত্র-চলাচল থামিয়ে দেয়। ভিসা নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ে ক্যাম্পাস বন্ধ হয় বা ক্লাসের সময় বদলাতে হয়। আবাসন-সংকট বিদেশে পড়ার নীতিকে বদলে দেয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষাদান ও মূল্যায়নকে অনিশ্চিত করে তোলে। মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা নিঃশব্দে শেখার ক্ষমতাকে ক্ষয় করে। এখন এই চাপগুলোর একটিও আলাদা থাকে না। তারা একে অন্যের সঙ্গে ধাক্কা খায়, জট পাকায়, আর একের পর এক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

এ এক অন্যরকম উচ্চশিক্ষা-সংকট

এই কারণেই বর্তমান উচ্চশিক্ষার সংকট আগের সংকটগুলোর মতো নয়, যেগুলো বিশ্ববিদ্যালয় কোনোভাবে সামলে নিতে পারত। এখনকার সমস্যা মূলত সিলেবাস সংস্কার, অ্যাক্রেডিটেশন, পড়ানোর পদ্ধতি, বা কোনো বিভাগে আরও শিক্ষক লাগবে কি না—এসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অবশ্যই এই বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আজ সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলো আসছে শ্রেণিকক্ষের বাইরে থেকে। সেগুলো ভূ-রাজনৈতিক, জলবায়ুগত, প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক এবং মানসিক। ইউরোপে যুদ্ধ হলে কলকাতার এক মেডিকেল ছাত্রের ভবিষ্যৎ কেঁপে ওঠে। পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা বাড়লে লন্ডন থেকে হায়দরাবাদে ফিরতে চাওয়া এক ছাত্রের বিমানভাড়া হঠাৎ আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। কানাডায় আবাসন-সংকট তৈরি হলে হাজার হাজার ভারতীয় পরিবারের বিদেশে পড়ার স্বপ্ন সঙ্কুচিত হয়ে যায়। ওড়িশায় তাপপ্রবাহ এলে বিকেলের বদলে ভোরবেলায় শুরু করতে হয় পড়াশোনা।

ভারতের জন্য এটা কোনো পাশের গল্প নয়। এটাই মূল গল্প। ভারতের রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা, বিপুল যুবসমাজ, এবং শিক্ষা যে সম্মান ও উন্নতির পথ—এই বিশ্বাসের দীর্ঘ ঐতিহ্য। একই সঙ্গে ভারত গভীরভাবে যুক্ত বৈশ্বিক অভিবাসন, উপসাগরীয় অর্থনীতি, পশ্চিমা শিক্ষাবাজার, জলবায়ু-চাপ ও ডিজিটাল রূপান্তরের সঙ্গে। তাই পৃথিবী অস্থির হলে ভারতীয় উচ্চশিক্ষা দূর থেকে তাকিয়ে থাকে না। সঙ্গে সঙ্গে সেই কম্পন অনুভব করে।

আমরা এমন এক যুগে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে শ্রেণিকক্ষ আর বাইরের পৃথিবী থেকে আশ্রয় নয়। বরং আজ পৃথিবীর গভীরতম ফাটলগুলোর প্রতিফলন সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায় এখানেই।

হাতির দাঁতের মিনার আর সাদা নেই

“আইভরি টাওয়ার” বা হাতির দাঁতের মিনার কথাটার মধ্যে সবসময়ই একটু অহংকার ছিল। যেন বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ জীবনের কোলাহল, চাপ, দুশ্চিন্তা ও বস্তুগত সংগ্রাম থেকে অনেক দূরে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর বড় অংশ জুড়ে সত্যিই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিছুটা সুরক্ষিত ছিল। সরকার পাল্টাত, বাজার উঠত-নামত, তবু বিশ্ববিদ্যালয়কে ভাবা হতো দীর্ঘস্থায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে। ধীর প্রতিষ্ঠান। স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান। এমন জায়গা, যেখানে সময় যেন অন্যভাবে চলে।

সেই সুরক্ষা এখন ভীষণভাবে দুর্বল হয়ে গেছে।

কারণ শুধু এই নয় যে উচ্চশিক্ষা এখন বিশ্বায়িত। আসল কথা, উচ্চশিক্ষা এখন গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে বহু অনিশ্চিত ব্যবস্থার সঙ্গে। বিশ্ববিদ্যালয় এখন আন্তর্জাতিক ছাত্রদের টাকার ওপর নির্ভর করে, আন্তর্জাতিক বিমান ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে চলাচলের জন্য, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে, সীমান্ত-পেরোনো গবেষণা-যোগাযোগের ওপর নির্ভর করে মর্যাদা অর্জনের জন্য, আর আন্তর্জাতিক রাজনীতির ওপর নির্ভর করে ভিসা পাওয়ার জন্য। এমন অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় আর শুধু একটি ক্যাম্পাস নয়। এটি একটি বিশাল অথচ অস্থির নেটওয়ার্কের অংশ। নেটওয়ার্ক কাঁপলে নোডও কাঁপে।

এখানেই পলিক্রাইসিস ধারণাটি খুব কাজে লাগে। শুনতে একাডেমিক মনে হলেও, এর অর্থ ভীষণ বাস্তব। এর মানে হলো সংকট আর একা আসে না। তারা দল বেঁধে আসে। যুদ্ধ দাম বাড়ায়। দাম বাড়লে ছাত্রের চাপ বাড়ে। চাপ শেখার ক্ষতি করে। ভিসা নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক ভর্তি কমে। ভর্তি কমলে আর্থিক দুর্বলতা বাড়ে। টাকা কমলে ছাত্র-সহায়তা কমে যায়। জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ে ক্লাস ব্যাহত হয়। এআই মূল্যায়নকে আরও অনিশ্চিত করে। সংকট কোনো একক আঘাত নয়, বরং আঘাতের পর আঘাত।

ফলে আজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর দায় পড়েছে শুধু শিক্ষা দেওয়ার নয়; তাদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে নড়বড়ে জমির ওপর দাঁড়িয়েও সচল থাকা।

যখন ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে, ছাত্রও দৌড়ায়

যুদ্ধের মতো নির্মমভাবে আর কিছুই দেখায় না যে উচ্চশিক্ষা কতটা ভঙ্গুর।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তার অন্যতম স্পষ্ট উদাহরণ। যুদ্ধের আগে ইউক্রেন কম খরচে উচ্চশিক্ষার, বিশেষ করে চিকিৎসাশিক্ষার, একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। ভারতে যেসব পরিবার বেসরকারি মেডিকেল শিক্ষার বিপুল খরচ বহন করতে পারত না, তাদের কাছে ইউক্রেন ছিল ডাক্তার হওয়ার এক বাস্তব পথ। ফি তুলনামূলক কম ছিল। ডিগ্রির স্বীকৃতি ছিল। স্বপ্নের একটা রাস্তা ছিল।

তারপর যুদ্ধ শুরু হলো, আর সেই রাস্তা ভেঙে গেল।

এটা শুধু গোলার আঘাতে বিধ্বস্ত শহরের গল্প নয়। এটা শিক্ষার পথ এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ার গল্পও। লেকচার হল বাঙ্কারে পরিণত হলো। অ্যানাটমি ল্যাব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। যে ছাত্রছাত্রীরা বিদেশে গিয়েছিল ডাক্তার হতে, তারা হঠাৎ বর্ডার পার হওয়ার হিসাব কষতে লাগল, খাবার বাঁচিয়ে খেতে লাগল, বেসমেন্টে বসে মোবাইল চার্জ করতে লাগল, আর নিরাপদ পথ খুঁজতে লাগল। ভারতের অপারেশন গঙ্গা ২২,০০০-রও বেশি ভারতীয়কে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরিয়ে আনে। কিন্তু উদ্ধার ছিল কেবল প্রথম ধাপ। বড় প্রশ্ন ছিল—যে দেশে পড়াশোনা চলছিল, সেই দেশ যদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে ছাত্রের ভবিষ্যৎ কোথায় দাঁড়াবে?

ভারতে এই প্রশ্ন খুব তীব্রভাবে ধরা পড়েছিল, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে। যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা বহু ছাত্র ও কর্মী রাজ্যে ফেরে। যে পরিবার একসময় গর্ব করে বলত, ছেলে বা মেয়ে “ইউক্রেনে এমবিবিএস করছে”, তারা হঠাৎ বলতে শুরু করল—ট্রান্সফার, রেগুলেশন, স্বীকৃতি, সিট, ইন্টার্নশিপ, ক্লিনিক্যাল পোস্টিং। রাজ্য সরকার মানবিক ও সৃজনশীল কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। প্রথম বর্ষের মেডিকেল ছাত্রদের রাজ্যের মেডিকেল কলেজে রাখার চেষ্টা হয়। সিনিয়র মেডিকেল ও ডেন্টাল ছাত্রদের সরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারিক কাজ ও ইন্টার্নশিপ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্রদের কিছু বেসরকারি কলেজে স্থানান্তর করা হয়। ভেটেরিনারি ছাত্রদেরও ব্যবস্থা করা হয়। উদ্যোগটি মানবিক ছিল, আন্তরিকও ছিল। কিন্তু এই ঘটনাই দেখিয়ে দিল নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সীমা কতটা কঠিন। ভারতীয় মেডিকেল শিক্ষায় বিপুল সংখ্যক ছাত্রকে রাতারাতি নেওয়া যায় না। শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত, ক্লিনিক্যাল প্রয়োজন, সিটের সীমা—সবই বাস্তব।

এখানেই ভারতের গল্পটি আরও ধারালো হয়ে ওঠে। এই সংকট দেখিয়ে দিল যে ভারতীয় পরিবারগুলো যে সত্য অনেক আগেই জানত, তা হলো—শিক্ষা শুধু স্বপ্ন নয়, এটি এক ভঙ্গুর লজিস্টিকস চেইনও। এক ভূ-রাজনৈতিক বিস্ফোরণই সেই শৃঙ্খল ছিঁড়ে দিতে পারে।

ইউক্রেনের ভেতরে ক্ষয়ক্ষতি ছিল আরও গভীর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়েছে, ল্যাব হারিয়ে গেছে, শিক্ষক-গবেষকেরা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বহু জায়গায় অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে পড়াশোনা চালাতে হয়েছে, যেখানে শিক্ষা আর নিয়মিত একাডেমিক চর্চা নয়, বরং মানসিকভাবে টিকে থাকার এক অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়কে জরুরি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।

আরও একটি প্রভাব ছিল, যা কম দৃশ্যমান হলেও বহু জায়গায় অনুভূত হয়েছে। পূর্ব ইউরোপের যুদ্ধ খাদ্য সরবরাহের চেইন ব্যাহত করে এবং বিশ্বজুড়ে দাম বাড়িয়ে দেয়। তার অর্থ, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহু দূরের দেশেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যানটিনের খরচ বাড়ে, ছাত্রাবাসে থাকার ব্যয় বাড়ে। আজকের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এমনকি ক্যানটিনের বিলেও বিদেশি যুদ্ধের ছায়া পড়ে।

আকাশপথ বন্ধ হলে শিক্ষার পথও সঙ্কুচিত হয়

ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছিল যুদ্ধ কীভাবে শিক্ষার রাস্তা ভেঙে দেয়। আর মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দেখায়, বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার পুরো যন্ত্রটাই কত দ্রুত থমকে যেতে পারে।

এই অঞ্চল উচ্চশিক্ষার কাছে দুটি বড় কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান বিমান চলাচলের করিডর। দ্বিতীয়ত, এটি শ্রম-অভিবাসন ও রেমিট্যান্সের একটি বিশাল কেন্দ্র, যা দক্ষিণ এশিয়ার লক্ষ লক্ষ পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য অস্থির হলে তার প্রভাব পড়ে শিক্ষায়—একদিকে যাতায়াতে, অন্যদিকে অর্থনীতিতে।

ভারতের বহু পরিবারের কাছে এটা কোনো দূরের বিষয় নয়। ভারত থেকে ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় যাওয়া অনেক ছাত্র উপসাগরীয় বিমানবন্দর ঘুরে যায়। বিদেশে পড়তে থাকা কোনো ছাত্রের হয়তো জরুরি কারণে দেশে ফিরতে হবে—পরিবারের অসুখ, ভিসা সংক্রান্ত সমস্যা, কিংবা সেমেস্টারের বিরতি। শান্ত পরিস্থিতিতে সেই যাত্রা কষ্টকর হলেও সম্ভব। কিন্তু সামরিক উত্তেজনা বেড়ে গেলে তা হয়ে উঠতে পারে ক্লান্তিকর এবং ভীষণ ব্যয়বহুল। কোনো একটি রুট, যার খরচ ছিল প্রায় ৪৫,০০০ টাকা, সেটাই যুদ্ধজনিত ঘুরপথের কারণে ২ লক্ষ টাকারও ওপরে চলে যেতে পারে। এটা নিছক অসুবিধা নয়। এটা চলাচলকে এক মুহূর্তে অধিকার থেকে বিশেষ সুবিধায় পরিণত করে।

উপসাগরীয় অঞ্চল আরেক কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। তারা নিজেদের শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তুলেছে। দুবাইয়ে বহু আন্তর্জাতিক ব্রাঞ্চ ক্যাম্পাস আছে। কাতারের এডুকেশন সিটি এখন বিশ্বজোড়া পরিচিত। এই ব্যবস্থাগুলো ছাত্রদের টেনেছে, কারণ এখানে ছিল আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, ভৌগোলিক নৈকট্য, অবকাঠামো, আর এক ধরনের স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি খুব ভঙ্গুর। ভারতীয় বাবা-মা একবার যদি ভাবতে শুরু করেন যে কোনো অঞ্চল আর নিরাপদ নয়, তবে ছাত্রপ্রবাহ বদলে যায়। কয়েক দিনের জন্য অনলাইন ক্লাস চালু করা সহজ। কিন্তু মানুষের মনে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা এত সহজ নয়।

তারপর আসে রেমিট্যান্সের প্রশ্ন, আর এখানে ভারতের গল্প আরও জটিল হয়ে ওঠে। ভারত বছরে আনুমানিক ১৩০ থেকে ১৪০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পায়, যা তাকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রাপক করে তুলেছে। এর একটি বড় অংশ আসে উপসাগরীয় অর্থনীতি থেকে। অগণিত ভারতীয় পরিবারের জন্য, বিশেষ করে কেরালার মতো রাজ্যে, আবার দেশের নানা জায়গাতেও, এই অর্থ শুধু খাবার বা বাড়িভাড়ার জন্য নয়; শিক্ষার জন্যও। এই টাকা দিয়ে ফি দেওয়া হয়, কোচিং করানো হয়, হোস্টেলের খরচ মেটানো হয়, স্নাতকোত্তরের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখা হয়। তাই উপসাগরে অস্থিরতা তৈরি হলে তার অভিঘাত সেখানেই থেমে থাকে না। দুবাইয়ে চাকরির সংকট তৈরি হলে কলকাতায় এক ছাত্রের পড়া ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সৌদি আরবে মন্থরতা এলে কেরালায় কারও মাস্টার্স করার পরিকল্পনা পিছিয়ে যেতে পারে। নিচুতলার বিশ্বায়ন আসলে এমনই—একটি শিশুর শিক্ষা নির্ভর করে বহু দূরের শ্রমবাজারের স্বাস্থ্যের ওপর।

অর্থাৎ শিক্ষা আর অভিবাসন এখন শক্ত সেলাইয়ে জোড়া। একদিকে টান পড়লে অন্যদিকেও ছিঁড়ে যায়।

পশ্চিম আর আগের মতো স্থায়ী ভরসা নয়

দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় মধ্যবিত্তের উচ্চাশার মানচিত্র মোটামুটি একই ছিল। সেরা ছাত্রছাত্রীরা লক্ষ্য রাখত আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার দিকে। এই দেশগুলোকে দেখা হতো স্থিতিশীল, সম্মানজনক এবং নির্ভরযোগ্য শিক্ষাগন্তব্য হিসেবে। কিন্তু সেই মানচিত্র বদলাচ্ছে।

পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদেরও এক গভীর সংকটের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছে, যার বড় অংশের সঙ্গে একাডেমিক মানের সম্পর্ক খুব কম। তাদের মডেল এমনভাবে গড়ে উঠেছিল যে আন্তর্জাতিক ছাত্রদের উচ্চ ফি অনেক ক্ষেত্রেই পড়াশোনা, অবকাঠামো এবং গবেষণার ব্যয় বহন করত। বৈশ্বিক ছাত্র-চলাচল যতদিন বাড়ছিল, ততদিন এই মডেল চলছিল। কিন্তু রাজনীতি, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় এখন সেই কাঠামোকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।

ব্রেক্সিটের পরে যুক্তরাজ্য তার অভিঘাত টের পায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ছাত্ররা, যারা আগে অনেক ক্ষেত্রে দেশীয় ছাত্রদের মতো ফি-সুবিধা পেত, তারা হঠাৎ আন্তর্জাতিক ফি ও ভিসার নিয়মের মুখে পড়ে। ভর্তি কমে যায়। আর্থিক চাপ বাড়ে। যে শিক্ষাব্যবস্থা নিজেকে খুব আত্মবিশ্বাসী ভাবত, সেটিই রাজনৈতিক মেজাজের বদলে দুর্বল হয়ে পড়ে।

তারপর কানাডা আরও জোরালো সংকেত দেয়। ভারতীয় ছাত্রদের কাছে কানাডা আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল, কারণ সেটি একসময় আমেরিকার তুলনায় বেশি নাগালযোগ্য এবং ব্রিটেনের তুলনায় কিছুটা বেশি স্বাগতপূর্ণ মনে হতো। কিন্তু আবাসন-সংকট ও অবকাঠামোর চাপে তা রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠে, আর সরকার আন্তর্জাতিক স্টুডেন্ট পারমিটে সীমা আরোপ করে। ভারতের ওপর নির্ভর করে যেসব কলেজ ভর্তি কাঠামো তৈরি করেছিল, তারা হঠাৎ বড় ধাক্কা খায়। ভারতীয় পরিবারগুলোর কাছে এটি ছিল এক কঠিন বাস্তবতা—বিদেশে পড়ার পরিকল্পনা এখন আর শুধু নম্বরের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে অন্য দেশের আবাসন-রাজনীতির ওপরও।

আমেরিকার সমস্যা একটু ভিন্ন। সেখানে আছে ডেমোগ্রাফিক ক্লিফ—অর্থাৎ জন্মহার কমে যাওয়ায় কলেজগামী বয়সের ছাত্রসংখ্যা কমছে। ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দার পর জন্মহার হ্রাস পায়, আর তার প্রভাব এখন কলেজে পৌঁছেছে। ফলে দেশীয় ছাত্র কমছে। ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এর অর্থ প্রবল প্রতিযোগিতা, সংযুক্তিকরণ, বন্ধ হয়ে যাওয়া, আর চার বছরের ডিগ্রির বদলে স্বল্পমেয়াদি কোর্সের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হওয়া। পশ্চিমের অনেক জায়গায় উচ্চশিক্ষা আর বিস্তৃত হচ্ছে না; বরং সঙ্কুচিত হচ্ছে।

ভারতের কেন এতে মাথাব্যথা থাকবে? কারণ কোটি কোটি ভারতীয় পরিবারের কাছে পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠান ছিল না। সেটাই ছিল উচ্চাশার দিগন্ত। আর এখন সেই দিগন্ত অনিশ্চিত, ব্যয়বহুল এবং রাজনৈতিক হয়ে উঠছে।

এই অনিশ্চয়তা যেমন ঝুঁকি তৈরি করছে, তেমনই সুযোগও তৈরি করছে। যদি ঐতিহ্যগত গন্তব্যগুলো ক্রমে বেশি নিয়ন্ত্রিত বা অস্থির হয়ে ওঠে, তবে ভারত নিজের অবস্থান নতুনভাবে তৈরি করতে পারে। কিন্তু তা হবে তখনই, যখন ভারত একটি কঠিন শিক্ষা নেবে—আন্তর্জাতিকীকরণ কেবল প্রচারের স্লোগান নয়। এর জন্য লাগে শক্তিশালী গবেষণা-পরিবেশ, বিশ্বাসযোগ্য প্রশাসন, স্থিতিশীল নীতি, ছাত্র-সহায়তা ব্যবস্থা, এবং সংকটের সময়েও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা।

এখন ক্লাসরুমের সময় ঠিক করছে তাপ

বহু বছর ধরে জলবায়ু পরিবর্তনকে উচ্চশিক্ষায় একটি পড়ার বিষয় হিসেবে দেখা হতো। এখন তা দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা।

এটাই বর্তমান সংকট-যুগের এক বড় পরিবর্তন। জলবায়ু আর শুধু সেমিনারের বিষয় নয়। এখন এটি বদলে দিচ্ছে শিক্ষাবর্ষের ক্যালেন্ডার, ক্লাসরুমের আরাম, ছাত্রদের স্বাস্থ্য, অবকাঠামোতে খরচ, এমনকি দিনের কোন সময়ে নিরাপদে পড়ানো যাবে, সেটাও। ইউনিসেফের হিসাবে, ২০২৪ সালেই ২৪ কোটির বেশি ছাত্রছাত্রীর পড়াশোনা জলবায়ুজনিত ঘটনার কারণে ব্যাহত হয়েছে। এই সংখ্যা স্পষ্ট করে দেয়—জলবায়ু এখন শিক্ষার বাইরের বিষয় নয়।

ভারত এই বাস্তবতার খুব উজ্জ্বল উদাহরণ। তাপপ্রবাহ এখন আরও ঘন ঘন আসছে, আরও তীব্র হচ্ছে। ওড়িশার মতো রাজ্যে চরম গরমের সময় প্রতিষ্ঠানগুলিকে সকালবেলায় ক্লাস ও পরীক্ষা সরিয়ে আনার নির্দেশ দিতে হয়েছে। শুনতে প্রশাসনিক বদল মনে হলেও, এর অর্থ অনেক বড়। যখন গরম নির্ধারণ করে কখন ক্লাস হবে, তখন প্রকৃতি আর পটভূমি নয়; সে-ই প্রতিষ্ঠানকে চালিত করছে।

এবং শুধু গরমই নয়। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, উপকূলীয় ঝুঁকি—সব মিলিয়ে ক্যাম্পাস, হোস্টেল, যাতায়াত এবং ফিল্ডওয়ার্ক সবকিছুই প্রভাবিত হয়। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ভালো হতে পারেন, সিলেবাস ভালো হতে পারে; কিন্তু ছাত্র যদি নিরাপদে ক্লাসে পৌঁছাতে না পারে, হোস্টেলে থাকা অসহনীয় হয়ে ওঠে, বারবার ব্যাঘাতে ল্যাব চালানো না যায়, তাহলে শিক্ষার মান চুপিসারে ক্ষয় হতে শুরু করে। র‍্যাঙ্কিংয়ে তার সবটুকু ধরা পড়ে না।

ভারতের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জলবায়ু-চাপ এবং শিক্ষাগত বৈষম্য অনেক সময় একে অন্যের সঙ্গে মিলে যায়। বড়, সমৃদ্ধ ক্যাম্পাস ভবন সংস্কার করতে পারে, কুলিং ব্যবস্থা বসাতে পারে, ড্রেনেজ উন্নত করতে পারে, জরুরি সিস্টেম গড়ে তুলতে পারে, সহজে হাইব্রিড শিক্ষায় যেতে পারে। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর সেই ক্ষমতা নেই। বিশাল কিন্তু অসম অবকাঠামোর দেশে জলবায়ু-সহনশীলতাই নতুন শিক্ষাবৈষম্যে পরিণত হতে পারে।

তাই জলবায়ু-সহনশীলতা এখন আর পরিবেশের আলাদা কোনো বাড়তি বিষয় নয়। এটি একাডেমিক ধারাবাহিকতার কেন্দ্রীয় অংশ।

সবচেয়ে নিঃশব্দ সংকটই হয়তো সবচেয়ে গভীর

কিছু সংকট টেলিভিশনের পর্দায় বিস্ফোরণ হয়ে আসে। কিছু আবার নীরবে ছড়ায়। মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট দ্বিতীয় ধরনের।

ক্যাম্পাসজুড়ে উদ্বেগ, হতাশা, একাকীত্ব, আবেগগত ক্লান্তি—সবই এখন ক্রমশ দৃশ্যমান। মহামারি এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করে থাকতে পারে, কিন্তু একে সৃষ্টি করেনি। আজকের তরুণরা উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করছে একসঙ্গে বহু অদৃশ্য বোঝা বয়ে নিয়ে—অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সোশ্যাল মিডিয়ার তুলনামূলক চাপ, চাকরি নিয়ে ভয়, জলবায়ু-উদ্বেগ, ভূ-রাজনৈতিক উৎকণ্ঠা, এবং বহু ক্ষেত্রে লকডাউনের সময়কার শিক্ষাবিচ্ছেদের দীর্ঘ ছায়া। শিক্ষকরাও নিজস্ব চাপ বহন করছেন—বেশি প্রশাসনিক কাজ, বেশি প্রকাশনার চাপ, দ্রুত ডিজিটাল হতে বাধ্য হওয়া, বেশি ছাত্র-দুর্দশা সামলানো, অথচ কম প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা। ফল হলো এমন এক বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থা, যা কাগজে সচল, কিন্তু বাস্তবে ক্লান্ত।

ভারতের ক্ষেত্রে এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে সাফল্য নিয়ে কথা অনেক বেশি হয়, আবেগগত সুস্থতা নিয়ে কম। কোনো ছাত্র পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে, ভর্তি পেতে পারে, নিয়মিত ক্লাসেও আসতে পারে—তবু ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়তে পারে। কোনো শিক্ষক বাইরে থেকে নিয়মানুবর্তী ও দক্ষ দেখাতে পারেন, অথচ ভিতরে চরম ক্লান্তিতে পুড়তে পারেন। এভাবে যখন একটি পুরো প্রতিষ্ঠানে তা ছড়ায়, তখন ক্ষতিটা সূক্ষ্ম হলেও গভীর হয়। মনোযোগ কমে, আত্মবিশ্বাস ক্ষয়ে যায়, ক্লাসে অংশগ্রহণ কমে, পড়া ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, শিক্ষার গভীরতা হারিয়ে যায়।

তাই মানসিক স্বাস্থ্য একাডেমিক মানের বাইরে কোনো আলাদা বিষয় নয়। বরং তা শিক্ষার গোপন ভিতগুলোর একটি।

আর যেহেতু এই সংকট যুদ্ধ বা বন্যার মতো নাটকীয় নয়, তাই একে অবহেলা করা সহজ। এখানেই বিপদ। যে বিশ্ববিদ্যালয় উৎকর্ষের দাবি করে কিন্তু কাউন্সেলিং বা সুস্থতাকে পাশের বিষয় হিসেবে দেখে, তারা সময়কে ভুল পড়ছে। এই দশকে আবেগগত অবকাঠামোও শিক্ষাগত অবকাঠামোর অংশ।

শ্রেণিকক্ষের ভেতরে এআই-ঝড়

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন যুদ্ধ, অভিবাসন-অনিশ্চয়তা আর জলবায়ু-চাপ সামলাতে শিখছে, ঠিক তখনই ডিজিটাল জগৎ থেকে আরেক ধাক্কা এলো। জেনারেটিভ এআই অবিশ্বাস্য দ্রুততায় একাডেমিক জীবনের নিয়ম বদলে দিল।

প্রথম দুশ্চিন্তাটা ছিল স্পষ্ট—জালিয়াতি। যদি একটি টুল কয়েক সেকেন্ডে প্রবন্ধ, সারাংশ, কোড বা গবেষণার খসড়া লিখে দিতে পারে, তাহলে বাড়ির কাজের মূল্য কী থাকে? কিন্তু গভীরতর প্রশ্নটি তারও বাইরে। এআই বিশ্ববিদ্যালয়কে এক অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে—আসলে তারা কী মূল্যায়ন করছে? একটি মেশিন যদি মন্দ নয় এমন একাডেমিক ভাষা তৈরি করতে পারে, তবে লিখিত জমা কী প্রমাণ করে? জ্ঞান? লেখার দক্ষতা? প্রম্পট দেওয়ার ক্ষমতা? সম্পাদনার বিচারবুদ্ধি? নাকি শুধু টুলে প্রবেশাধিকার?

ভারতের জন্য এই প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে বিশাল ছাত্রসংখ্যা মূল্যায়নকে আগেই জটিল করে রেখেছে। বড় ক্লাসরুম আর পরীক্ষাকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় এআই পুরনো সমস্যাকে আরও বড় করে তুলতে পারে। কিন্তু এআই শুধু হুমকিও নয়। বিপুল ছাত্রসমাজ ও বহু-ভাষিক বাস্তবতায় এটি টিউটরিং, অনুবাদ, খসড়া তৈরি, ব্যক্তিগত সহায়তা—এসব ক্ষেত্রেও কাজে আসতে পারে। প্রশ্ন হলো এআই-কে নিষিদ্ধ করা যাবে কি না—তা নয়। নিষিদ্ধ করা সম্ভবই নয়। প্রশ্ন হলো, উচ্চশিক্ষা কি যথেষ্ট দ্রুত নিজের শিক্ষণ-পদ্ধতি বদলাতে পারবে, যাতে সততা, মানবিক বিচারবোধ এবং সত্যিকারের শেখা কেন্দ্রে থাকে?

এজন্য বহু বিশ্ববিদ্যালয় এখন মৌখিক পরীক্ষা, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, যৌথ কাজ এবং এমন নানা পদ্ধতি নিয়ে ভাবছে, যা কেবল চকচকে লেখা নয়, বাস্তব বোঝাপড়াকেও যাচাই করবে। এই পরিবর্তন জরুরি। কিন্তু সহজ নয়। এর জন্য সময় লাগে, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ লাগে, এবং প্রতিষ্ঠানগত সাহস লাগে। এআই শুধু নতুন একটি সরঞ্জাম আনেনি; এটি মৌলিকতা, লেখকত্ব এবং শেখার প্রমাণ নিয়ে পুরনো ধারণাগুলিকেই নাড়িয়ে দিয়েছে।

শান্ত সময় হলে বিশ্ববিদ্যালয় হয়তো এই রূপান্তর ধীরে-সুস্থে সামলাতে পারত। কিন্তু এআই এসেছে এমন এক সময়ে, যখন যুদ্ধ, মূল্যবৃদ্ধি, মানসিক ক্লান্তি ও সামাজিক অবিশ্বাস আগে থেকেই জমে আছে। তাই এটি শুধু প্রযুক্তিগত ধাক্কা নয়; বৃহত্তর পলিক্রাইসিসেরও একটি অংশ।

ভারতের সামনে সুযোগও আছে, পরীক্ষাও আছে

এই সব অস্থিরতার মাঝেও বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার মানচিত্র বদলাচ্ছে। পুরনো সেই ধারণা—পশ্চিমই সবসময় স্থিতিশীল, আর বাকি পৃথিবী শুধু ছাত্র পাঠায়—এখন আর ততটা স্থায়ী দেখায় না। গ্লোবাল সাউথের বহু দেশ নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থা প্রসারিত করছে। ভারতও সেই পরিবর্তনের অংশ। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ একটি আরও আন্তর্জাতিক, আন্তঃবিষয়ক এবং বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত ব্যবস্থার কথা বলে। ভারত ২০৩০ সালের মধ্যে আরও বেশি আন্তর্জাতিক ছাত্র আকর্ষণের লক্ষ্যও দেখিয়েছে। জনসংখ্যাগত অবস্থানও ভারতের পক্ষে—যখন পশ্চিমের বহু দেশে তরুণ জনসংখ্যা কমছে, তখন ভারতে এখনও কলেজগামী বয়সের জনসংখ্যা বড় এবং শক্তিশালী।

কিন্তু জনসংখ্যাই ভাগ্য নয়। আকার মানে মান নয়। উচ্চাশা মানে প্রস্তুতি নয়।

ভারত যদি এই নতুন বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার মানচিত্রে শক্তিশালীভাবে উঠতে চায়, তবে বিশ্বজুড়ে যে সংকটগুলো দেখা যাচ্ছে, সেখান থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আগামী দিনের আন্তর্জাতিক ছাত্র শুধু কম খরচ বা বিজ্ঞাপনের চকচকে প্রতিশ্রুতিতে প্রতিষ্ঠান বেছে নেবে না। সে জিজ্ঞেস করবে—সংকটের সময় এই প্রতিষ্ঠান কতটা নির্ভরযোগ্য? যোগাযোগ কি পরিষ্কার? পড়াশোনা কি বিঘ্ন ছাড়াই অন্য মোডে নেওয়া যায়? আন্তর্জাতিক ছাত্রদের জন্য বাস্তব সহায়তা আছে কি? গরম, বন্যা বা অস্থিরতার সময় ক্যাম্পাস নিরাপদ কি? মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সত্যিকারের, নাকি শুধু কাগুজে? একাডেমিক প্রশাসন বিশ্বাসযোগ্য কি? আজ এই প্রশ্নগুলোর গুরুত্ব র‍্যাঙ্কিংয়ের কাছাকাছি এসে গেছে।

এখানেই ভারতের প্রসঙ্গ খুব বাস্তব হয়ে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্য, যেখানে জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য আছে, শহুরে সংস্কৃতির শক্তি আছে, তারা উচ্চশিক্ষার আগামী পর্বে বড় ভূমিকা নিতে পারে—যদি একাডেমিক কল্পনাশক্তির সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সহনশীলতাকে জুড়তে পারে। ইউক্রেনফেরত ছাত্রদের ঘটনায় দেখা গিয়েছিল মানবিকতা আছে। এখন দরকার সিস্টেম—স্থায়ী প্রোটোকল, নমনীয় একাডেমিক পথ, ক্রেডিট স্থানান্তর, শক্তিশালী ছাত্র-সহায়তা, এবং এমন সংকট-প্রস্তুতি যা বিপর্যয় নামার পর শুরু হয় না।

যে বিশ্ববিদ্যালয় এই দশক টিকে থাকবে

আপলোড করা লেখাটির মূল শিক্ষা এখন স্পষ্ট। ভবিষ্যতের বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু স্বাভাবিক সময়ের জন্য বানালে চলবে না। তাকে বানাতে হবে বিঘ্নের সময়ের জন্যও।

তার মানে এক নতুন ধরনের প্রতিষ্ঠান। সংকট-প্রস্তুত প্রতিষ্ঠান। যে স্থিতিশীলতাকে ধরে নেয় না, অনিশ্চয়তাকেই স্বাভাবিক বলে ধরে। যার যোগাযোগব্যবস্থা এত শক্তিশালী যে সীমান্ত পেরিয়েও কাজ করে। যে প্রয়োজনে অনলাইনে যেতে পারে, কিন্তু গুণগত মান ভেঙে পড়তে দেয় না। যার জরুরি পরিকল্পনা, ছাত্রকল্যাণ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, জলবায়ু-সহনশীলতা, ডিজিটাল প্রশাসন এবং নৈতিক এআই নীতি—এসব আলাদা প্রকল্প নয়, বরং মূল কাঠামোর অংশ।

সবচেয়ে বড় কথা, এমন বিশ্ববিদ্যালয়কে বুঝতে হবে যে আস্থা নিজেই এক ধরনের অবকাঠামো। অস্থির পৃথিবীতে ছাত্র ও অভিভাবক এখন শুধু নাম-যশ দেখে প্রতিষ্ঠান বিচার করেন না। তারা দেখেন—চাপের সময় প্রতিষ্ঠান কী করে। মানুষকে রক্ষা করে কি? সত্যি কথা বলে কি? দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে কি? সবকিছু স্বাভাবিক বলে ভান না করে, পড়াশোনাকে জীবিত রাখতে পারে কি?

এই কারণেই শিক্ষাগত উৎকর্ষের অর্থ বদলে যাচ্ছে। আজকের মহান বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শান্ত পরিস্থিতিতে ভালো পড়ায় এমন প্রতিষ্ঠান নয়। বরং সেই প্রতিষ্ঠান, যা পৃথিবী অস্থির হলেও শিক্ষা, গবেষণা, যত্ন এবং চিন্তার কাজ চালিয়ে যেতে পারে।

শেষ সত্যটি

আজকের উচ্চশিক্ষার সংকট একটি গল্প নয়। বহু গল্প একসঙ্গে এসে মিশেছে।

এটি সেই ভারতীয় মেডিকেল ছাত্রের গল্প, যে ইউক্রেনে গিয়ে বুঝল আর্টিলারির শব্দে ক্যারিয়ারও ভেঙে যেতে পারে। এটি কেরালা বা কলকাতার সেই পরিবারের গল্প, যারা বুঝল উপসাগরের অস্থিরতা ফি দেওয়ার সামর্থ্যকেও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এটি কানাডার আবাসন-সংকট কীভাবে ভারতীয় ছাত্রের সিদ্ধান্ত বদলে দেয়, তার গল্প। এটি ওড়িশার তাপপ্রবাহ কীভাবে ক্লাসের সময়সূচি বদলে দেয়, তার গল্প। এটি সেই ছাত্রের গল্প, যে বাইরে থেকে একেবারে স্বাভাবিক দেখায়, অথচ ভেতরে ভেতরে অসহনীয় উদ্বেগ বয়ে বেড়ায়। এটি সেই শিক্ষকের গল্প, যিনি এআই-ভরা যুগে মানবিক শেখা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন, তা বুঝতে লড়ছেন।

আলাদা করে দেখলে প্রতিটি ঘটনাই গুরুতর। একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়—এগুলোই উচ্চশিক্ষার নতুন বাস্তবতা।

আর এই বাস্তবতা আমাদের বাধ্য করে বিশ্ববিদ্যালয়কে আর নিরাপদ দ্বীপ বলে না ভাবতে। তারা তা নয়। তারা আজ গভীরভাবে উন্মুক্ত প্রতিষ্ঠান, যেগুলো যুক্ত অভিবাসন, অর্থপ্রবাহ, প্রযুক্তি, জলবায়ু এবং ক্ষমতার বৃহৎ স্রোতের সঙ্গে, যা একবিংশ শতাব্দীকে গড়ছে। কিন্তু এই উন্মুক্ততাই তাদের গুরুত্ব কমায় না। বরং আরও বাড়ায়।

কারণ পৃথিবী যখন অস্থির হয়, বিশ্ববিদ্যালয় তখন শুধু ডিগ্রি দেয় না। তারা ধারাবাহিকতা বাঁচিয়ে রাখে। তারা উচ্চাশাকে জোড়া লাগিয়ে রাখে। তারা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, ডিজাইনার, ম্যানেজার, গবেষক এবং নাগরিক তৈরি করে, যারা বিশৃঙ্খলার মধ্যেও অর্থ খুঁজে নিতে পারে। জনজীবন যখন কোলাহলপূর্ণ, ভীত বা ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে, তখন তারাই জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে রাখে।

ক্যাম্পাস আর ইতিহাসের বাইরে নেই। বরং ইতিহাস আজ প্রথম এসে পড়ে এখানেই। আর ভারতসহ সারা বিশ্বের উচ্চশিক্ষার আসল পরীক্ষা এখন আর এই নয় যে শান্তির সময়ে তারা কতটা উজ্জ্বল দেখায়। আসল পরীক্ষা হলো—যুগ যখন উত্তাল, তখনও তারা কতটা টিকে থাকতে পারে, মানিয়ে নিতে পারে, এবং শিক্ষা জারি রাখতে পারে।

Ujjwal Anu Chowdhury

Add comment

Most popular